4রাত ১টা ছুঁই ছুঁই, চারোদিক সুনশান নিরভতা, দূরগ্রাম থেকে একটু পর পর ভেসে আসছে দু-একটি কুকুরের ঘেঁও ঘেঁও আওয়াজ। আর পাশের ডোবায় ব্যাঙের পেঁ-ফুঁ ডাক, মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে, যদিও আকাশ চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। জনমানব শূন্য যাত্রী ছাহনীর টেবিলে বসে কাঁদছে একটি মেয়ে। বয়স ১৭ কি ১৮ হবে। মেয়েটির দিকে চোখ পরতে মনে হলো আকাশের চাঁদটি যেনো মাটিতে নেমে এলো। কিন্তু এত সুন্দর একটি মেয়ে বসে বসে কাঁদছে কেন? হয়তো শতজনমের কোনো চাপা কষ্ট কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে মেয়েটিকে। তার একটু দূরেই শুয়ে আছে সূর্য পাগলা নামের এক লোক। জনশ্রুতি রয়েছে ২০ বছর যাবত নাকি সূর্য পাগলা কারো জন্য এ রেল ষ্টেশনে অপেক্ষা করছে তবে কেউ বিরক্ত না করলে কারো কোনো ক্ষতি করে না। রাত যত বাড়ছে মেয়েটির কান্নার আওয়াজ ও বাড়তে লাগলো। মেয়েটির কান্নার আওয়াজে অতিষ্ট হয়ে সূর্য পাগলা উঠে মেয়েটির কাছে যেতেই মেয়েটির চোখ পড়লো লোকটির উপর। প্রায় ৫০ উর্ধ্ধো এক বয়স্ক লোক, চুলগুলো উসকো-খুসকো। দাঁড়ি-গোঁফে কেচি লাগেনি দীর্ঘদিন হয়তো সময় পায়নি। গায়ে একটি সাফারী স্যূট তাও আবার ধূলা-বালিতে চটের বস্তার মতো তেল-তেলে ভরা ভীষন দুর্গন্ধযুক্ত। মেয়েটি প্রথমে ভয় ফেলেও পরে সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করলো কি চাই? লোকটি কোনো কথা না বলে এক পলকে তাকিয়ে রইলো মনে হলো জনম জনমের চেনা। কেনো জানি মনে হলো মেয়েটির সাথে তার অস্তিত্বের সম্পর্ক রয়েছে। এবার মেয়েটি তার গায়ের ওড়নাটি নিজের নাকে মুখে চেপে ধরে আবারও জিজ্ঞেস করলো বল্লামনা কি চাই? আপনার শরীর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে প্লীজ এখান থেকে সরে দাঁড়ান। এবার লোকটি মুখ খুল্লো এক পালি দাঁত বের করে বল্ল, জীবিত মানুষের গায়ের গন্ধ সহ্য করতে পারোনা মরা মানুষের গন্ধ সহ্য করবা কেমনে? এতো রাতে এখানে বসে বসে কাঁদছো কেন? সেটা কি আপনাকে বলতে হবে? হ্যাঁ বলতে হবে, কারন এ পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ কাঁদতে পারবেনা। পৃথিবীরি সমস্ত দুঃখ-কষ্ট শুধু আমার জন্য অন্য কাউকে কাঁদতে দেখলে আমার মাথায় খুন চেপে যায়। কথাটি শুনে মেয়েটি ভয়ে কাঁপতে লাগলো। এবার লোকটি মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বল্ল ভয় পেয়োনা মা, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবোনা, তুমি কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমার? বাবা/মার উপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি। ছি! ছি! বাবা/মার উপর কোনো সন্তান রাগ করতে পারে? মাগো এখন অনেক রাত একা যেতে পারবেনা, চারোদিকে কেউ না থাকলেও চোর ডাকাতের ভয় আছে। অবশ্য সূর্য পাগলাকে সবাই ভয় পায়। আমি থাকলে তোমার কোনো ভয় নেই চলো ভোর হওয়া পর্যন্ত আমরা দু’জনেই গল্প করে কাটিয়ে দেই। আজ ২০ বছর কারো সাতে গল্প করতে পারিনি। আপনি বাড়ি যাবেননা? এটাইতো আমার বাড়ি। ২০ বছর যাবত আমি এই রেল ষ্টেশনে একজনের অপেক্ষায় বসে আছি। কে সে? আমার ভালোবাসা, যে অন্যের হাত ধরে ২০ বছর আগে আমাকে চেড়ে চলে গেছে। একি! আপনি কাঁদছেন? বলেছিলামনা পৃথিবীর সমস্ত চোখের জল আমার জন্য তাই কাঁদছি। আপনিকি তাকে খুব ভালোবাসতেন? হ্যাঁ অনেক বেশী। তাহলে ধরে রাখতে পারলেননা কেন? হয়তো ভাগ্যে নেই তাই। এটা একদম মিথ্যা কথা, ভাগ্যকে দোষ দেওয়া আপনাদের পুরুষদের একটা অভ্যাস। না রে মা তাহলে শোনো আমরা দু’জন দু’জনকে প্রাণের চেয়েও বেশী ভালো বাসতাম। আমাদের মাঝে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলোনা। একদিনও একে অন্যকে না দেখে থাকতে পারতামনা, আমাদের মাষ্টার্স পরীক্ষার পর আমরা দু’জন বিয়েও করেছি কিন্তু এটার সামাজিক কোনো বৈধতা ছিলোনা। এক সময় ওর গর্বে আমার সন্তান জন্ম নেয় কিন্তু আমাদের সেই সন্তান পৃথিবীতে আশার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে যায়। সেদিন আমরা দু’জনই খুব কষ্ট পেয়েছি খুব কেঁদেছি। এর কিছুদিন পরই মেযেটি আমাকে কিছু না জানিয়ে অতি লোভে, অতি উৎসাহিত হয়ে, অতি সুখের আশায মহা ধুমধামে অন্যকে বিয়ে করেছিলো। আয়োজনে কিংবা সাজ-সজ্জ্বায় যেনো কমতি না হয় সে জন্য অন্যের কাছ থেকে টাকা পর্যন্ত ধার করেছিলো। অন্য ছেলের জন্য নিজেকে সাজিয়েছিলো অপরুপ সাজে। কতো সহজে অস্বীকার করলো আমার সাথে কাটানো দিনগুলোর কথা সেই সাতে আমার সন্তানকেও। একবারও চিন্তা করলোনা তাকে হারিয়ে আমি কি ভাবে থাকবো। এই সেই রেল ষ্টেশন এখান থেকেই সে অন্যের হাত ধরে চলে গিয়েছিলো। ২০ বছর যাবোত তার জন্য আমি এ রেল ষ্টেশনে অপেক্ষা করে আছি কত ট্রেন এলো গোলো কিন্তু সে আর ফিরে এলোনা। কষ্ট পাবেননা চাচা, যে মেয়ে আপনার সাথে এতো কিছু করে অন্য কারো সাথে সংসার করতে পারে সে যে কত বড় দুশ্চরিত্রা তা আমার জানা হয়ে গেছে। একবার চিন্তা করে দেখেন মেয়েটি কয়টি অন্যায় করেছে, সে আপনাকে কাঁদিয়ে যাকে বিয়ে করেছে ঐ ছেলেকে ঠকিয়েছে, ঐ ছেলের পরিবারকে ঠকিয়েছে, ঐ দুশ্চরিত্রা মেয়ের কোনো সন্তান হলে তারাও ঠকবে। মিথ্যা বলা মহাপাপ কিন্তু অতীতকে আড়াল করার জন্য ঐ দুশ্চরিত্রা মেয়েকে সারা জীবন মিথ্যা কথা বলে অভিনয় করে যেতে হবে সবার সাথে। হয়তো এটাই তার পাপের শাস্তি। পৃথিবীতে যত শ্রেষ্ঠ ইবাদাতই করুক না কেন তারপরও তার এ পাপ মোচন হবেনা। ক্ষমা পাবেনা সয়ং বিধাতার কাছেও। এ জাতীয় দুশ্চরিত্রা মহিলার জন্য শুধু অন্তর থেকে একটাই উচ্চারন ছি!। আমার মা যাদি এমন কাজ করতো আমি যদি কখোনো শুনতাম আমি তাকেও ক্ষমা করতামনা, প্রয়োজনে আত্নহত্যা করে হলেও নিজেকে কলঙ্কমুক্ত করতাম। মেয়েটিতো ঠিকই সুখে সংসার করছে। অথচো আপনি আজও সেই দুশ্চরিত্রা মহিলার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছেন। আপনার এই অনোবরত চোখের জলই প্রমান করছে আপনি তাকে কতোটা ভালোবাসতেন, আসলে আমি প্রথমে আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম। আচ্ছা ঐ মহিলা কি খুব বেশী সুন্দর ছিলো? হ্যাঁ একদম তোমার মতো, অবিকল তোমার চেহারা। নানা এ হতে পারেনা একজন দুশ্চরিত্রা মহিলার চেহারার সাথে আমার মিল হতে পারেনা। হ্যাঁরে মা আমিও চিন্তা করছি এটা কিভাবে সম্ভব? তবে আমার মায়ের চেহারার সাথে আমার মিল রয়েছে। সবাই বলে আমি নাকি আমার মায়ের মত দেখতে হয়েছি। তা্ই? হ্যাঁ। তোমার মায়ের নাম কি? আমার মায়ের নাম সঞ্চিতা। নামটি শুনে সূর্যের বুকটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠলো। তা হলে কি………… তার পরও জিজ্ঞেস করলো তোমার নামটা কিন্তু আমার জানা হলোনা। বাবা ডাকে পুতুল, আর মা ডাকে রশ্মী বলে। দুইজন দুইটা কেন? এখানেইতো সমস্যা জম্মের পর থেকেই দেখে আসছি বাবা/মা একজন অন্যজনকে দেখতে পারেনা। প্রতিদিনই ঝগড়া-ঝাটি করে। একে অন্যের গায়ে হাত-তোলার মত জঘন্য কাজ পর্যন্ত করে। ইদানিং বাবা মদ খেয়ে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে মা কিছু বল্লেই গায়ে হাত তোলে। গতকালও তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে দু’জন আমার সামনেই মারামারি লেগেছে এই দৃশ্য দেখে আমি লজ্জ্বায় ঘর থেকে রাগ করে বের হয়ে চলে আসছি। কথাগুলো শুনে সূর্যের সারা শরীর হিম হয়ে আসছে, তাহলে এ কি সঞ্জিতার মেয়ে? না না সঞ্জিতার সাথে আমার সম্পর্কের কথা মেয়েটিকে জানানো যাবেনা। তাহলে ও সারা জীবন ওর মাকে ঘৃনা করবে, তাহলে কি ২০ বছরের অপেক্ষার প্রহর আজই শেষ হয়ে যাবে? সঞ্জিতাকে কি মন থেকে মুচে ফেলতে হবে? কথাগুলো ভাবার মধ্যেই রশ্মি চিৎকার করে বলতে লাগলো ঐ দেখেন ট্রেন আসছে আমার মন বলছে এই ট্রেনে আজ সত্যিই আপনার ভালোবাসার মানুষটিকে খুজে পাবেন চলেন গিয়ে দেখি …………………………………./// সত্যিইকি এই ট্রেনে সঞ্চিতা এসেছিলো কিনা তা আমাদের জানা নেই, নাকি তার স্বামী নিজের পথের কাঁটা দূর করতে………..? তাও আমরা জানতে পরিনি, অথবা স্বামীর অনবরত নির্যাতনের মাত্রা সইতে না পেরে সঞ্চিতা নিজেই………………….? তাও আমাদের অজানা, কিন্তু এই ট্রেনেই একটি বগিতে একটি বেওয়ারিশ মহিলার লাশ পাওয়া গিয়েছিলো। তা হলে লাশটি কার? তাও আমরা জানতে পারিনি//–………………. পড়ুন রেদোয়ান শাহ্জীর লেখা উপন্যাস “জীবন থেকে নেয়া”