ওজন বাড়লে যা হয় – Harmful Effects of Over Weight

fat-skinny

ওজন বাড়লে যা হয় – Harmful Effects of Over Weight

বাড়তি ওজন মানেই বাড়তি বোঝা। আবার ঝুঁকিপূর্ণও। শরীর ও মনে নানা রোগ বাসা বাঁধে। ওজন কমে গেলে কেউ কেউ বিষণ্নতায় ভোগেন। অনেকে মেদ কমাতে গিয়ে খাওয়া একেবারেই কমিয়ে দেন। ডায়েট কন্ট্রোল করা মানে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করা নয়! এতে প্রয়োজনীয় শক্তির অভাবে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ওজন কমানোর কার্যকরী তেমন কোনো ওষুধ নেই। বাজারে যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোও তেমন কোনো সুফল বয়ে আনে না। বরং ক্ষতি হতে পারে শরীরের।

কেন ওজন কমাবেন?
* স্থূল ব্যক্তিদের ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি হয়। আবার ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে তার সঙ্গে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতাগুলোও বেশি মাত্রায় দেখা দেয়।
* শরীরে অতিরিক্ত চর্বি বা ডিজলিপিডিমিয়া প্রায়ই দেখা দেয়। রক্তে কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। রক্তনালির দেয়ালে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়ার কারণে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপ সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি হয়। এমনকি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। রক্তনালিতে থ্রম্বোসিস হয়ে তা বন্ধ হয় এবং বিভিন্ন জটিল রোগ হতে পারে। যেমন হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মাথার রক্তনালি বন্ধ হয়ে মৃত্যুও ঘটতে পারে।
* অতিরিক্ত ওজন বহন করার জন্য অস্থিসন্ধিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। অস্থির সংযোগ স্থলে বা জয়েন্টে বেশি ওজনের ফলে নতুন অস্থি তৈরি হয়। আকারে পরিবর্তন হয়ে ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ নামক রোগটি দেখা দেয়। জয়েন্টে ফ্লুয়িড জমে যেতে পারে, পরবর্তী সময়ে অস্থিসন্ধি শক্ত (স্টিফ) হয়ে যায়। মেরুদণ্ড, কোমর ও হাঁটুতে ব্যথা বা প্রদাহ বেশি মাত্রায় দেখা দেয়।

* বেশি চর্বি জমা হওয়ার কারণে পেটের এবং পায়ের মাংসপেশির সংকোচন ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে হার্নিয়া হতে পারে
এবং পায়ের শিরায় ভেরোকোসিটি দেখা দেয়।
* সাধারণ লোকদের তুলনায়, বিশেষত চল্লিশোর্ধ নারীদের পিত্তথলির পাথর বেশি মাত্রায় হয়ে থাকে।
* লিভারের কোষে চর্বি জমা হওয়ার কারণে ফ্যাটি চেঞ্জ হয়। ফলে লিভারের বিভিন্ন জটিলতা, এমনকি সিরোসিস-জাতীয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
খাদ্যনালি, কোলন, লিভারের ক্যানসার এবং লিস্ফনোডের ক্যানসার থেকে মৃত্যুঝুঁকি স্থূল লোকদের বেশি।
* নাক ডাকা, স্লিপঅ্যাপনিয়া জাতীয় রোগ বেশি হয়। শ্বাসপ্রশ্বাসের অসুবিধা, দিন ও রাত উভয় সময়েই বেশি ঘুম, ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা, মুখ হা করে শ্বাস-প্রশ্বাস ও পলিসাইথিমিয়া হতে পারে।

মোটা বা স্থূলতার কারণ
* কারও কারও জেনেটিক বা বংশগত কারণেই মোটা হওয়ার ধাত তৈরি হয়।
* অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ মোটা হওয়া বা ওজন বাড়ার অন্যতম কারণ। মনে রাখতে হবে, অতিভোজনই অতি ওজন। অনেকেই বলে থাকেন, অমুকের সঙ্গে একই খাদ্য খাই, এমনকি আমি তো অত খাই না, অথচ তার ওজন বাড়ে না, আমার কেন বাড়ে। প্রশ্নটা যৌক্তিক। মনে রাখতে হবে, ওজন বাড়াটা শুধু খাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। এটা জমা-খরচের মতো। সারা দিন কাজকর্ম বা পরিশ্রম করে কতটুকু শক্তি ÿক্ষয় হলো, সেটার ওপরও নির্ভর করে। খাবারের মধ্যে যা শক্তি সঞ্চয় হয়, কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের মাধ্যমেÿক্ষয় না হলে, ওজন বাড়তেই থাকবে।
* পরিশ্রমবিহীন অলস জীবন মোটা হওয়ার অন্যতম কারণ।
* অ্যালকোহল, এনার্জি ও হেলথ ড্রিংকস, কোমল পানীয়, ফাস্ট ফুড ইত্যাদি মোটা হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
* অ্যান্ড্রোক্রাইন ও হরমোনজনিত রোগ, যেমন হাইপোথাইরয়েডিজম, কুশিং সিনড্রোম ইত্যাদি।
* দীর্ঘদিন যাবৎ কিছু কিছু ওষুধ ব্যবহারের ফলে মোটা হওয়ার প্রবণতা থাকে। যেমন স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ।

ওজন কমাবেন কীভাবে
* প্রথমেই মনে রাখতে হবে, দ্রুত বা তাড়াহুড়ো করে ওজন কমানো সম্ভব নয়। নিয়মমাফিক ধৈর্য সহকারে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। শারীরিক কোনো রোগ শনাক্ত করা গেলে সে অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। এ ছাড়া ওজন কমানোর অন্যান্য পদ্ধতিগুলো আপনার নিজের হাতের মুঠোতেই। পেটটা অতিরিক্ত খেয়ে ভর্তি না করাই ভালো। বরং পেটের কিছুটা অংশটা খালি রাখা ভালো।
* ওজন সীমিত রাখতে পরিমিত খাবার খেতে হবে।
* কম ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
* ফাস্ট ফুড-জাতীয় খাদ্য এবং বাইরের খাবার না খাওয়া।
* ভাত কম খাওয়াই উচিত। খাওয়ার আগে শসা, টমেটো, পেয়ারা খেয়ে নিলেও বেশি ভাত খেতে ইচ্ছে করবে না।
* খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত খাবার, ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যেন থাকে।
* চিনি, মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা। যেকোনো উৎসবেও পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে।
* বাড়তি চর্বি পোড়ানোর জন্য প্রতিদিন পরিশ্রম করতে হবে। হাঁটা, লিফটে না চড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, অল্প দূরত্বে গাড়ি বা রিকশায় না চড়ে হেঁটে চলার অভ্যাস করতে হবে। এগুলো শরীরের মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। সম্ভব হলে ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম, সাঁতার কাটা, সাইক্লিং, জগিং ইত্যাদি অভ্যাস করা ভালো। সুযোগ থাকলে ওজন কমানোর জন্য জিমেও যেতে পারেন।

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ 

ডিন, মেডিসিন অনুষদ, অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *